‘বিকশিত ভারতের লক্ষ্যে কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’, দিল্লিতে জাতীয় সম্মেলনে বার্তা
‘বিকশিত ভারতের লক্ষ্যে কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’, দিল্লিতে জাতীয় সম্মেলনে বার্তা
নয়াদিল্লি, ১০ অক্টোবর ২০২৬: দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রকৃত সার্থকতা তখনই অর্জিত হয়, যখন সেই উন্নয়নের সুফল সমাজের মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক উন্নয়নের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়। এমনই মন্তব্য করলেন কেন্দ্রীয় কয়লা ও খনি মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী সতীশ চন্দ্র দুবে। তিনি বলেন, শক্তিশালী সমাজ, বৃহত্তর সুযোগ এবং বিপর্যয় মোকাবিলায় সক্ষম অঞ্চল গড়ে তোলার মধ্যেই অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ নিহিত রয়েছে।
নয়াদিল্লিতে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্সের (IICA) উদ্যোগে আয়োজিত তৃতীয় জাতীয় কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা সম্মেলন ও প্রদর্শনী (NCCSR 2026)-এর উদ্বোধন করে তিনি এই বক্তব্য রাখেন। ৬ ও ৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত দুই দিনের এই সম্মেলনের মূল বিষয় ছিল, ‘বিকশিত ভারতের জন্য কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার চেতনাকে নতুনভাবে উপলব্ধি: বাধ্যবাধকতা থেকে অঙ্গীকার’।
উদ্বোধনী ভাষণে সতীশ চন্দ্র দুবে বলেন, প্রাকৃতিক সম্পদনির্ভর শিল্পক্ষেত্রে অর্থনৈতিক বৃদ্ধি এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সামাজিক উন্নয়নকে কখনও পৃথকভাবে দেখা উচিত নয়। কয়লা ও খনি-সহ বিভিন্ন সম্পদনির্ভর শিল্পের উন্নয়নের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, জীবিকার সুযোগ বৃদ্ধি এবং সামাজিক পরিকাঠামো উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
এই অনুষ্ঠানে ভারতীয় কয়লা সংস্থাগুলির জন্য একটি সমন্বিত কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (CSR) কাঠামো প্রকাশ করা হয়। এই কাঠামোর উদ্দেশ্য হল কয়লা ক্ষেত্রে সামাজিক উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলিকে আরও সুসংগঠিত, স্থানীয় চাহিদাভিত্তিক এবং ফলাফলকেন্দ্রিক করে তোলা। পাশাপাশি, ‘ইন্ডিয়া সিএসআর ফ্যাক্টবুক ২০২৪–২৫’ প্রকাশ করা হয়, যেখানে ভারতের কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার বর্তমান পরিস্থিতি ও অগ্রগতির একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় কর্পোরেট বিষয়ক মন্ত্রকের সচিব ড. পল্লবী জৈন গোভিল, ভারতে রাষ্ট্রসংঘের মহিলা সংস্থা (UN Women)-এর প্রতিনিধি শোকো ইশিকাওয়া, IICA-র ডিরেক্টর জেনারেল ও সিইও জ্ঞানেশ্বর কুমার সিং এবং IICA-র স্কুল অব বিজনেস এনভায়রনমেন্টের প্রধান অধ্যাপক গরিমা দাধিচ-সহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।
উদ্বোধনী বক্তব্যে ড. পল্লবী জৈন গোভিল বলেন, কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতাকে শুধুমাত্র বার্ষিক আইনি বাধ্যবাধকতা হিসেবে বিবেচনা করলে চলবে না। দেশের উন্নয়নে দায়িত্বশীল শিল্প ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের বৃহত্তর অবদান নিশ্চিত করার জন্য CSR-কে দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার হিসেবে দেখতে হবে। তাঁর মতে, বিকশিত ভারত গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সরকার, শিল্পক্ষেত্র এবং সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ হল কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা।
IICA-র ডিরেক্টর জেনারেল ও সিইও জ্ঞানেশ্বর কুমার সিং বলেন, CSR প্রকল্পের প্রকৃত মূল্য বোঝা যায় তার বাস্তব প্রভাবের মাধ্যমে। বোর্ডরুমে নেওয়া সিদ্ধান্তের সুফল শেষ পর্যন্ত স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, জীবিকাভিত্তিক প্রকল্প, গ্রাম ও শহরের মানুষের জীবনে প্রতিফলিত হওয়া উচিত। তিনি জানান, জাতীয় CSR প্রদর্শনীর লক্ষ্য শুধুমাত্র বিভিন্ন প্রকল্প প্রদর্শন করা নয়, বরং সাফল্যের অভিজ্ঞতা বিনিময়, কার্যকর উদ্যোগের পুনঃপ্রয়োগ এবং পারস্পরিক সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করা।
সম্মেলনের আলোচনায় কর্পোরেট সংস্থাগুলির পরিচালন পর্ষদের ভূমিকা, CSR প্রকল্পের পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং প্রকল্পের ফলাফল মূল্যায়নের বিষয়গুলি বিশেষ গুরুত্ব পায়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সামাজিক উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে স্থানীয় মানুষের প্রকৃত চাহিদা চিহ্নিত করা, কার্যকর নজরদারি চালানো এবং দীর্ঘমেয়াদি সুফল মূল্যায়ন করা জরুরি।
এছাড়াও, বিভিন্ন শিল্পক্ষেত্রের চাহিদা অনুযায়ী CSR প্রকল্প গ্রহণ এবং রাষ্ট্রসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs)-এর সঙ্গে এই প্রকল্পগুলির সামঞ্জস্য বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে কর্পোরেট সংস্থাগুলির সামাজিক উন্নয়নে অবদান আরও সুস্পষ্টভাবে পরিমাপ করা সম্ভব হবে বলে আলোচনায় উঠে আসে।
সম্মেলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় ছিল সোশ্যাল স্টক এক্সচেঞ্জের ভূমিকা। সামাজিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত উদ্যোগগুলির সঙ্গে অর্থায়নের সংযোগ স্থাপন, প্রকল্পের প্রভাব পরিমাপ এবং স্বচ্ছতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সামাজিক ক্ষেত্রের আর্থিক সহায়তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়।
প্রথম দিনের আলোচনায় সরকারি দপ্তর, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা, বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক সংস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। আলোচনায় CSR-কে শুধুমাত্র নিয়ম মেনে চলার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবসম্মত, পরিমাপযোগ্য এবং দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তোলার ওপর ঐকমত্য প্রকাশ পায়।
বিকশিত ভারতের লক্ষ্যে CSR-এর নতুন দিশা
NCCSR 2026-এর মূল বার্তা হল, কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা যেন কেবল আইনি বাধ্যবাধকতা পূরণের মাধ্যম না হয়ে ওঠে; বরং সমাজের প্রকৃত চাহিদা পূরণ, স্থানীয় উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। সরকারি সংস্থা, শিল্পক্ষেত্র ও সামাজিক সংগঠনগুলির সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনই এই সম্মেলনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।
Source : PIB
